fbpx

মা অভাগিনী

Just another WordPress site

মা অভাগিনী

মা অভাগিনী

অলংকরণ: তুলি

মো. জিয়াউদ্দিন শাহ, জেদ্দা (সৌদি আরব) থেকে ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:৪৬ 
আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:৪৯

মাকে নিয়ে কলম ধরলেই ঘটে সমস্যা! অভাগিনীর দুঃখের কথা কীভাবে লিখব ভেবে পাই না। দুঃখিনীর কত দুঃখই তো দেখলাম। আমি জন্মের আগে নাকি দুঃখগুলো ছিল আরও তরতাজা। আমি তাহলে দুঃখ গুছাতে এসেছি। ব্যাপারটা তা না। আমি শুধু নিতে এসেছি। সুসময়ে আসায় নিয়েছিও বেশি।

আমি জানি না। জানার কথাও না, সংসার টেকাতে কোন মা কী কষ্ট করেছেন। এই মায়ের জীবন দশা আমাকে দুঃখ ছাড়া কিছুই দিল না। সাধুবাদে বলেছিলাম, এই সংসারের সবার শরীরের চামড়ায় জুতো বানিয়ে দিলেও মা অভাগিনীর ঋণ শোধ হবে না। ঋণ এমনিতেই অশোধনীয়, এর ওপরে বাড়ছে ওজন। হিসাবগুলো কেউ দেয়নি। আমিই খুঁজে পাই ও নিই। কিছু সত্যকে এড়াতে পারলে এগুলোর জন্য দুঃখ হতো না। কেউ আবার তিরস্কার করে পণ্ডিতি একটু বেশি করি! কাজের বেলা ঠনঠন! যদিও ঠনাঠনে অনাস্থা আছে। তবুও এর দায়ভার নিতে হচ্ছে। আমি বেশি নেওয়ার স্বীকারোক্তি দিয়েছি। পণ্ডিত হলে নিজেকে নির্দোষ দাবির স্বীকারোক্তিও দিতাম। আমাকে আর কাঁদতে হতো না, আমি অপরাধী মহাপাপী মাগো ক্ষমা, ক্ষমা করো আমায়…।

পরিতাপের বিষয় হলো, সংসারের মঙ্গলে মায়ের অবদান সীমাহীন হলেও মাকেই পোহাতে হচ্ছে অবহেলিত দিন। মা কষ্টের দিনগুলো নিলেন একা, সুখের দিনে সবাই নিলেন ভাগা। বাবা নামের সুধা পান করে বসে আছেন। সংসারে ছোটবেলা থেকেই তাঁর বৈরাগী মনোভাব। স্বামী সংসারে মন না দিলে স্ত্রী হন নির্গত। মায়ের দশাও হলো তাই। বাবার ‘কোথা থেকে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়’ নাটক শেষ হয় না! সংসারপ্রিয় মায়ের দুঃখও ফুরায় না। আমি এই দুঃখিনীর দুঃখ-বর্ণনা শেষ করতে পারব না। দুঃখ গোছাতে দুঃখই হলো যার নিত্য পাওয়া।

বাবা সংসারে অমনোযোগী। দাদা, দাদি ও কাকার সংসারে এর দায়ভার সবই মায়ের! তাঁরা বৈরাগী ছেলেকে খুঁজবেন কেন? জায়গা জমিন ভাগ করে দাও, সে নিজের জ্বালা পোহাতে থাকুক। বাবাকে যদি জ্বালাই পোহাতে হবে তার নাম বৈরাগী কেন? না, না! বাবা সংসারের কোনো জ্বালা নেবেন না! মাকেই সব জ্বালা নিতে হবে। মা পেলেন ভিন্ন সংসার। বাড়ল সমস্যা ও অভাব। আধুনিক মায়েরা এত কষ্টের সংসার মেনে নেবেন না। বাড়ুক তালাক, বাড়ুক জ্বালা! আমার মাও যদি তাই করতেন, আজকের লেখাও গড়ে উঠত না। মায়ের মুখে শুনেছি স্বাধীনতার পর দুর্ভিক্ষে চালের সঙ্গে আলু মিশিয়ে ভাত রান্না করে খেয়েছেন। কখনো আটার জাউ খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। এমনকি আটাও অনেক সময় জোগাড় করতে পারতেন না! কত বেলা উপবাসে কেটেছে কেউ তার খবর নেয়নি!

এই সংসার, এই দেশ, এই অভাগিনীকে কিছুই দেয়নি! সংসার যা দিয়েছে এর চেয়েও বেশি তার কাছ থেকে নিয়েছে। শ্বশুর থেকে ভাগে পাওয়া জমিন শত কষ্টেও বিক্রি করেননি। বাবা বিক্রি করতে চাইলেও মা দেননি। উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া বাবার ৭৯ টাকার ছয় শতক জমিন কয়েক মাস আগে বিক্রি হলো ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায়। এই টাকা বড় ভাইয়ের স্ত্রীর ব্রেইন টিউমার অপারেশনে ব্যয় হলো। মা আজও পুরোনো দুঃখ স্মরণ করে বললেন, কত কষ্টে দিন গিয়েছিল, এক শতক জমিনও বিক্রি করিনি। মা অভাবের তাড়নায় এই জমিন বিক্রি করে খেতে পারতেন, সুযোগও ছিল। বাবাও এতে সায় দিতেন। মা তা করেননি। আমরা তিন ভাই আজ বাবার জমিনে কোটিপতি। জমির পেছনের গল্পগুলো মায়ের বিষাদ রক্তে গড়া।

কৌতূহল ভরা মন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, মা বলতো দেখি কতটা দশ টাকার নোটে এক হাজার টাকা হয়? মা জবাব দিলেন, আমি বলতে পারতাম না দেইখখা কী হইছে, বেডাগোরেকি বেশি দিয়ে আমু নাকি। মা আসলেই হিসাবের বাইরে কাউকে এক টাকাও বেশি দেন না। প্রয়োজনে একাধিক সাক্ষীতে হিসাব করিয়ে নেন। কিন্তু সংসার জ্বালার হিসাবতো কাউকে ছাড়ে না, ছাড় দেয় না! সরলতাকেও করে দোষের ভাগী! মাকে আজও কারও না কারও থেকে চেয়ে টাকা নিতে হয়। মা যদি বলেন, ওষুধ লাগবে, টাকা দে, মনটা আবেগে ভরে যায়! আমি বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছি না? টাকা যদি চেয়েই নিতে হয় দুঃখিনীর অভাব আর দূর হলো কোথায়? এই সংসার তাকে দিল কী?

অনুভূতির দ্বারে যাই বলি, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মা হাঁস-মুরগি পালতেন। ডিম খাওয়ানোর পরে বিক্রিও করতেন। আমি স্কুলে যেতে টাকার বাহানা দিলে সেই টাকা আমাকেই দিতেন। টাকা না থাকলে পাঁচ কেজি চাল দিয়ে বলতেন, তোর বাবা জানলে আমাকে মেরে ফেলবে! কিছু চাল বাচলে চৈত্র মাসে ভালো দামে বেচা যাবে। আমি পাঁচ কেজি চালের মূল্য বড়জোর ৪৫–৫০ টাকা পেতাম। তখন এ টাকায় বেশ কিছু দিন মউজ করেই চলতাম। সুযোগে আবারও চর্চা করতাম চাল নেওয়ার নতুন বাহানা। টের পাইনি, খেয়ালও করিনি! হঠাৎ হিসাব মিলিয়ে দেখি মায়ের আঁচল তলেই কেটে গেল জীবন খাতার বিশটি বছর।

এত দিনে মায়ের অভাব-অনটন প্রায় জাদুঘরে। মা মেহনত দিয়ে তিল থেকে তাল বানিয়েছেন। মুরগির ডিম বিক্রি করে গরু কিনেছেন। মার গোয়ালঘরে এখন একাধিক গরু। সঙ্গে আছে গাভি। ডোলা থেকেও হয়েছে ঘোলা। আমি গাভির দুধ পেটভরে খাই আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকি। বড় ছেলে দুজন একের পরে এক হালচাষ ধরেছেন। গরুর দুধ প্রতিদিন বিক্রিও করছেন। আর ভাতের অভাব নেই। একদিন ভাতের জন্য যিনি অনেক কষ্ট করেছিলেন সেই তিনি এখন আশপাশের ক্ষুধার্ত মানুষকে পেটভরে খেতে দেন। দুঃখিনী বোঝেন দুঃখের ব্যথা। আমরা ভুলতেই বসেছি, সবই ছিল মায়ের কষ্টের প্রতিদান।

বাবাও পরিশ্রমী ছিলেন। বয়েছিলেন কারও ময়লার বোঝা। বাবা মাইনা ছাড়া চাকরি নিয়েছেন। ময়লার জঙ্গল পরিষ্কার করে মনিবের দালান গড়ছেন। আমি নিজেই বাবাকে দেখেছি গর্তে নেমে দালানের ইট বসাতে। স্মৃতিগুলো বেশ ঘোলাটে, তেমন মনে নেই। দালানের ইট-পাথরগুলো আজ ঝরে ঝরে পড়ছে। বাবাকে যদি কেউ তিরস্কারে বলতেন, সংসার ছেড়ে এগুলো করার মানে কী? বাবা জবাব দিতেন, আমি মনিবের ঘরেই ভালো আছি। মনিবই আমার আপন। ‘দশানা (দশ আনা) খাজনায় সাড়ে তিন কানি জমিন পেয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নাই’। আমি এই কথার মানে কিছুই বুঝতাম না। না বুঝেই আবেগী চিত্তে বলতাম, বাবা যা বলছেন খারাপ কী? শুনতে তো বেশ ভালোই লাগছে। আকর্ষণীয় কথাবার্তা! অভ্যন্তরে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। আমার ক্ষুদ্র জীবন অভিজ্ঞতায় অদ্যাবধি যত মানুষ দেখেছি, বাবাই ছিলেন অতি অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার একমাত্র মানুষ।

নিজের মতো না হলে মা এক কথা বারবার বলেন! এই বলাবলি কেউ মানতে রাজি নন। হয়তো মানার কথাও না। মা শক্ত কথা বলেন, কথায় কোনো দরদ নেই। কথার মাঝে মিথ্যেও কিছু নেই। সত্য কথায় দরদের কিছু থাকে না, সত্য কঠিনই হয়। এই কঠিনতার কারণে আজও মায়ের দুঃখ ঘোচেনি! কেউ কারও মনে না লইলে যা ঘটে, মার কপালেও প্রতিনিয়ত তাই ঘটছে। কারও মনে স্বেচ্ছায় জায়গা না হলে এ যেন মিছামিছি সংসার, বনবাসের চেয়েও নির্জনতম জীবন। এই দুঃখিনীর জীবনটাই গেল অনাদরে! একটি মাত্র মেয়েও বিধাতা নিয়ে গেলেন। তার পক্ষে কথা বলার কেউ রইল না। ওপরওয়ালা অবশ্যই আছেন, কিন্তু পাশের শিক্ষিত তরুণীরা তো তাঁকে সহজে মেনে নিলেন না। আমি গভীর অন্বেষণে দেখেছি, মা কোনো না কোনো কারণেই বকবক করেন। তাতে কী, কারও ভাত কাপড়ে তো থাবা দেননি। মার তুলনায় এই তরুণীরা স্বর্গের সংসার করছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মা তার পক্ষেই বলেন যে ছেলের সমস্যা বেশি। এতে কারও ভালো-মন্দের ধার ধারি না। নিজের সায়েই বলে যান। মা হয়তো আমার সমস্যায় আরও বেশি বলতেন। আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন, মাকেও করতে হচ্ছে না দুশ্চিন্তা। সংসার বেড়াজাল কাউকেই ছাড় দেয় না। মা ভালো বলেও কারও জন্য ভালো হতে পারছেন না! প্রতিদানে শুনছেন, একের নুন খায় অন্যের গুণ গায়। সংসারে কিছু লোকের অভিযোগ মা তাদের অন্তর জ্বালিয়ে ফেলেছেন! এখানে এসে অন্তর সস্তায় জ্বলতে শুরু করেছে! জ্বলবে না কেন? ওরাও যে ছং বং সংসারে নিজের মনকে মজবুত করে লাগিয়েছেন। সংসারে একমাত্র বাবাই পেরেছেন জাদুকরী ক্ষমতা দেখাতে—‘সব থেকে যার কিছুই নেই এই মুসাফির খানা’। মা কোনো কারণে রেগে গেলে বাবাকে বলতেন, আমি সংসার নিয়ে একা কষ্ট করেছি। তুমি সর্বদা সংসার এড়িয়ে চলেছ, কিছুই করনি। আমি যা খুশি তাই বলব, এই সংসার একান্তই আমার! বাবা বলতেন, আমার বলতে কিছুই নাই। আমি নিজেই অন্যের। চোখ বুজলেই দুনিয়া আন্ধার।

আমার ভীষণ ইচ্ছে হয়, কোনো অলৌকিক ক্ষমতা পেয়ে বলি, সংসারে যাদের অন্তর জ্বলেপুরে ছারখার হতে লাগছে সেগুলো আমার কাছে জমা দাও। আমি দেখি মা কতটুকু জ্বালাতে পারে। মার সঙ্গে বিরোধ করে সংসারের কেউ কোনো দিন পারেননি, মাও কারও সঙ্গেই পারেননি। আমিও লিখে গেলাম না পারার গল্প। গল্পটা সুন্দরতম না হয়ে জটিলতম রূপ নিয়েছে! সবই যদি ঐশ্বরিক মা অভাগিনী পেয়েছে বেদনার্ত চোখের জল। অপচয়কারী সংসারে আছে ও থাকে। আমি ইনডাইরেক্টলি বোঝাতে গিয়ে আকার-ইঙ্গিতে বলি, ‘অপচয়কারী শয়তানের বড় ভাই’। বোন পর্যন্ত না গিয়েই বলি, অপচয়ের দায় কেউ এড়াতে পারবে না। বলেই টের পাই এর বেশি বোঝানোর পরিণাম হবে সংঘাত! কটু কথায়ও বোঝানো সম্ভব না, কেউ মানবেও না। বাবাও এত দিনে শিক্ষা দিয়েছেন, ‘শত-সহস্রবার বলায় আর মনের বিতৃষ্ণায় একবার না করায় সমান, সবই নিষ্ফল’। আমি অনুকরণে ক্ষান্ত। জীবনের এখানে এসে নিশ্চুপে উগ্রতার পরিণতি অবলোকন করেছি। আমার সঙ্গে এর বেশি যায় না। না যাওয়ার কারণেই হই ভীত! প্রথমে বেশি বুঝে হলাম পণ্ডিত, শেষে না বুঝে হলাম সিধা ও ভীত! উপায় নাই গোলাম হোসেন! সংসার পরিণতি কাউকে ছাড়েনি, ছাড়বেও না। এর অভ্যন্তরে গোলামির জ্বালা পোহাতেই হবে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কর্মফল পঙ্‌ক্তিকে আরও একবার শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, ‘রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রানি’।

মা ভীত ও সিধা কোনোটাই না। অপচয়ও বোঝেন না। তার অপচয় শব্দের সঙ্গে পরিচয় নেই। মা পান্তা ভাতে কাঞ্জি তুলে নতুন স্বাদ নেবেন আর নেবেন। নতুবা হাঁস-মুরগিকে খাওয়াবেন, কখনো এক মুঠো ভাত ফেলবেন না। মা ভাতের অতীত কষ্ট ভুলে যাননি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দিয়েছেন ভাতের নিরাপত্তা। প্রতিদান পাননি কিছুই! মা অভিমানে বলেছেন, জিয়াউদ্দিনের ভাত আর খামু না। আমি অমানুষের মতো জবাব দিলে লাভ কী। দিই বা কেমন করে? শুধুই বলেছি মাগো! আমি আবার ভাত পাইব কোথায়? আমি কি ভাত বানাই? তুমি আমার ভাত খাইলে আমি কার ভাত খাই? দুঃখিনীর চোখে আবারও আবেগ ভরা জল! আমি কারও চোখেই জল দেখতে চাই না। নিজেও কাঁদি না। যদি কেঁদেই ফেলি চাই নির্জনতা, বেদনাতুর অশ্রু জল কাউকেই দেখাতে পছন্দ করি না।

মামা বলেছিলেন, মা বলে আবার খারাপ হয়, গাধারা বলে কী? বেকুবের দল কোথাকার! কথার অর্থ অনেক বড়। কিন্তু আমি যে তার চেয়েও বড় অপরাধী। না পারলাম ভালো হতে, না পারলাম এই অবুঝ মনটাকে কারও মনের ওপরে রাখতে। আমার চোখের সামনেই অভাগিনীর সব দুঃখ বয়ে চলছে। মা মিষ্টি কথায় ভক্তি দিতে জানেন না, জানেন কর্মের ফল। মা কোনো দিনই সংসার-কাজে ভয় পাননি। আমি এত কাজ জীবনেও করিনি। বাবার মতো মাকেও মরণব্যাধি পেয়ে বসেছে। বাবা মরণ জয় করে গেছেন, মা মরণযুদ্ধ চালাচ্ছেন। আমি যুদ্ধের প্রহর গুনছি। মা যদি আজ সুস্থ হয়ে উঠতেন, আমার শত দুঃখেই সেবা দিতেন। যা আমি মাকে দিতে পারছি না। দুঃখেই মায়ের জীবন গেল দুঃখ গোছাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Show Buttons
Hide Buttons